দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে শূন্য অভিবাসন খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কর্মী বাছাইয়ে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

১০ হাজার কর্মী কীভাবে মালয়েশিয়া যাবেন?

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (BOESL)-এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মীদের ক্ষেত্রে বিমানভাড়াসহ অভিবাসন-সংক্রান্ত খরচ না রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটের মাধ্যমে প্রথম ব্যাচের কর্মীদের পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে বর্তমানে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। ৬ অক্টোবরের সর্বশেষ সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার নিয়োগ ব্যবস্থায় BOESL-কে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে ৮ অক্টোবরের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

কোন ধরনের কর্মী নেওয়া হবে?

এখনও সব পদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তবে কর্মী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের চাহিদাকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী নেওয়া হতে পারে। কর্মীদের যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে নির্বাচন করা হবে। নিয়োগদাতাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতারা ইতোমধ্যে চাহিদাপত্র দিচ্ছেন মালয়েশিয়ার বিভিন্ন নিয়োগদাতা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য চাহিদাপত্র দেওয়া শুরু করেছেন। বাংলাদেশ হাইকমিশন, কুয়ালালামপুরও মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের চাহিদাপত্র সত্যায়নের কাজ শুরু করেছে। এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার সুপারমার্কেট চেইন NSK Trade City-এর জন্য ২৮ জন বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়ন করা হয়েছে।

বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির ক্ষেত্রেও সুযোগ থাকবে

১০ হাজার কর্মীকে BOESL-এর মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন খরচে পাঠানোর উদ্যোগটি একটি পৃথক প্রক্রিয়া। এর পাশাপাশি প্রকৃত মালয়েশিয়ান নিয়োগদাতার চাহিদাপত্র থাকলে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি এজেন্সি যদি যথাযথ চ্যানেলে প্রকৃত, যাচাইকৃত ও সত্যায়িত Demand Letter পায়, তাহলে সেটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় যাচাই করে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

এখনই টাকা দেওয়া যাবে কি?

এখানেই চাকরিপ্রত্যাশীদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে সরকারি ঘোষণা বা নির্দিষ্ট নির্দেশনা আসার আগে কোনো দালাল বা ব্যক্তিকে টাকা দেওয়া, মেডিকেল পরীক্ষা করা কিংবা পাসপোর্ট জমা দেওয়া উচিত নয়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর খবরকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে ভিসা, কোটা ও Demand Letter-এর নামে টাকা চাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। তাই কর্মপ্রত্যাশীদের শুধুমাত্র সরকারি ও অনুমোদিত মাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করা উচিত।

মেডিকেল পরীক্ষা নিয়ে কী জানা গেছে?

নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়ার জন্য বর্তমানে মেডিকেল পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। ৬ অক্টোবরের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন প্রক্রিয়ায় কোনো মেডিকেল সেন্টারকে এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে মেডিকেল সেন্টার পরিদর্শন ও নির্বাচন করবে বলে জানানো হয়েছে। তাই অনুমোদনহীন কোনো প্রতিষ্ঠানে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল পরীক্ষা না করানোর জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

আগের আটকে থাকা কর্মীদের বিষয়টি কী হবে?

নতুন কর্মী পাঠানোর আগে ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার সময় যারা বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও যেতে পারেননি, তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। BOESL জানিয়েছে, আগের আটকে থাকা কর্মীদের একটি অংশের মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি আগের কর্মীদের সমস্যার সমাধান করাও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগ্রহ থাকলে এখন থেকেই নিজের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে নিজের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত ও প্রশিক্ষণের সনদ এবং কাজের অভিজ্ঞতার কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো। তবে সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কথায় টাকা দেওয়া উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি যদি “মালয়েশিয়ার ভিসা প্রস্তুত”, “কোটা নিশ্চিত”, “Demand Letter আছে” বা “আগে টাকা দিলে নাম নিশ্চিত হবে” বলে টাকা দাবি করে, তাহলে বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

উপসংহার

দীর্ঘ বিরতির পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন করে সুযোগ তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য অভিবাসন খরচে পাঠানোর উদ্যোগ কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। তবে এখনো নিয়োগের সব পদ, চূড়ান্ত যোগ্যতা, আবেদন শুরুর তারিখ ও বিস্তারিত প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হয়নি। তাই গুজব বা দালালের প্রচারণায় বিশ্বাস না করে সরকারি ঘোষণা ও BOESL-এর তথ্যের জন্য অপেক্ষা করাই সবচেয়ে নিরাপদ। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মালয়েশিয়ার এই নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কম খরচে এবং নিরাপদভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।